৫ কোটি সনাতনীকে উৎকৃষ্ট ব্রহ্মাজ্ঞানী তৈরি করতে পারলে পৃথিবী বদলে দেয়া সম্ভব

দেবাশীষ মুখার্জী (কুটনৈতিক প্রতিবেদক) : ইতিহাস সংশোধন করা দরকার। জাতিকে বিরাট ভুল ইতিহাস পড়ানো হয়েছে যে, সেন রাজারা ব্রাহ্মণ‍্যবাদী ছিল। অথচ সেন রাজাদের মতো ব্রাহ্মণ-বিদ্বেষী রাজবংশ, ভূভারতে দ্বিতীয়টি ছিল কিনা সন্দেহ। দ্বাদশ শতকে সেন রাজবংশের আক্রোশে বাংলার ৬০% মানুষ অস্পৃশ‍্যে পরিনত হয়েছে – যাদের সিংহভাগ ছিল বংশগত ব্রাহ্মণ,বাদবাকি ক্ষত্রিয় ও বৈশ‍্য। যদি ৫ কোটি সনাতন হিন্দুকে উৎকৃষ্ট ব্রহ্মাজ্ঞানীতে রূপান্তরিত করা যায় – তাহলে পৃথিবী তো বটেই – সমগ্র সৌরজগত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

একথা ঠিক যে, একাদশ শতকের শেষ দিকে সেনবংশ, শতাধিক বছরের জন্য ক্ষমতা করায়ত্ত না করতে পারলে, ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার মতো অবিভক্ত বাংলা, হিন্দু শূন্য হয়ে যেত। চারশো বছর স্থায়ী বৌদ্ধ-পাল সম্রাটদের শাসনে সনাতন সমাজে বৌদ্ধ-প্রভাব ভীষণ ভাবে বেড়ে যায়। বাঙালি-হিন্দুদের অনেক দেবদেবী তান্ত্রিক-বৌদ্ধ পাল শাসকদের কাছ থেকে এসেছে। আজও ভুটান, তিব্বত ও মঙ্গোলিয়ার তান্ত্রিক-বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর উপাস্য দেবতাদের সাথে, সনাতন সমাজের আরাধ্য দেবতাদের সাদৃশ্য বিদ‍্যমান।

অষ্টম শতকে বাংলায় রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হলে, শাসন ক্ষমতা ক্ষত্রিয়দের হাত থেকে বৌদ্ধ-পালদের হাতে চলে যায়। বৌদ্ধদের দীর্ঘ শক্তিশালী শাসনে, ক্ষমতাহারা ক্ষত্রিয়রা এক পর্যায়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হয়। এরা কৈবর্ত বা জেলে নামে পরিচিত। বৌদ্ধ শাসকরা প্রাণিহত‍্যা বন্ধের নামে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করলে, কৈবর্তদের রুটিরুজি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। হরি,রুদক,দিব‍্য প্রমুখ অকুতোভয় সমাজচ‍্যুত ক্ষত্রিয় যোদ্ধা, জননেতা ভীমের নেতৃত্বে, উত্তর বঙ্গে এক মহাবিপ্লব স‌ংঘটিত করে। ইতিহাসে যা

কৈবর্তরা বিদ্রোহ (১০৭৫-১০৮২ খ্রীঃ) নামে পরিচিত। পাল রাজশক্তি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ভাবে বিদ্রোহীদের দমন করলেও, ঐ বিদ্রোহে বৌদ্ধ সাম্রাজ্যের ভিত নড়ে যায়। শাসন ক্ষমতা চলে যায়, কর্ণাটকি সেন বংশের(১০৯৭-১২২৫ খ্রীঃ) হাতে। সেন শাসকগণ দাবি করেন যে, তারা ব্রহ্মক্ষত্রিয়। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ থেকে ক্ষত্রিয় হয়েছে। কিন্তু তারা যদি ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় হতেন, তাহলে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের এত ভয়ানক সর্বনাশ করতেন না। সেন শাসকরা, কৈবর্ত সহ অন‍্যান‍্য সমাজচ্যুত ক্ষত্রিয়দের পুরাতন সমাজে ফিরে আসতে দেন নি – তাদের অস্পৃশ্য বানিয়ে রাখা হয়। সেন রাজাদের সবচেয়ে বেশি আক্রোশ ছিল, ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে। বৌদ্ধ-প্রভাব মুক্ত হয়ে সনাতন সমাজে ফিরে আসা ব্রাহ্মণদের, সেন শাসকগণ অস্পৃশ‍্য ঘোষণা করেন। মহারাজা বিজয় সেন ও বল্লাল সেনের, ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণ বিদ্বেষ এবং বিভিন্ন নারীঘটিত অন‍্যায় আচরণে মর্মাহত হয়ে, কাশ‍্যপ গোত্রীয় প্রভাবশালী ব্রাহ্মণদের নেতৃত্বে যে সমস্ত ব্রাহ্মণ প্রতিবাদ করেছিলেন – সেন শাসক কর্তৃক ঐ ব্রাহ্মণদের অচ্ছুৎ-শূদ্র ঘোষণা করে, খুলনা-বরিশাল-যশোর-ফরিদপুর প্রভৃতি জঙ্গলাকীর্ণ শ্বাপদসংকুল উপকূলীয় অঞ্চলে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। রাঢ় ও বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে ঐ ব্রাহ্মণ বিতাড়ণ – আড়াই হাজার বছর পূর্বে জেরুজালেম থেকে ইহুদি বিতরণের সাথে তুলনীয়। বল্লাল সেন ভিন্ন রাজ‍্য থেকে ব্রাহ্মণ পুরুষ এনে স্থানীয় নারীদের সাথে বিয়ে দিয়ে, কুলীন ব্রাহ্মণ শ্রেণি সৃষ্টি করেন।

ব্রাহ্মণ থেকে অস্পৃশ্য শূদ্রে পরিনত হওয়া বিশাল জনগোষ্ঠী, অতীতের ব্রাহ্মণ পরিচয়ের জন্য সমাজে নমস্য শূদ্র নামে পরিচিত ছিল। নমস্য শূদ্রের অপভ্রংশ হচ্ছে ‘নমঃশূদ্র’। মতান্তরে, নমঃশূদ্ররা ‘নমস মুনি’ নামক এক বংশগত ব্রাহ্মণ ঋষির বংশধর – যারা বিজয় সেন ও বল্লাল সেনের নারী নির্যাতনের বিরোধিতা করতে গিয়ে, রাজরোশের প্রকোপে অস্পৃশ্য শূদ্র-এ পরিনত হয়ে, নমস্য ঋষির নাম অনুযায়ী নমঃশূদ্র নামে পরিচিত হয়। ঐ নমস ঋষির সরাসরি বংশধর হিসেবে, বংশানুক্রমিক চর্মকার পেশায় নিয়োজিতরা, ‘ঋষি সম্প্রদায়’-নামে পরিচিত। বংশগত ব্রাহ্মণ ঋষির বংশধর হওয়া সত্ত্বেও, ঋষি সম্প্রদায় সমাজে ‘দলিত’। নমঃশূদ্র ও ঋষিরা যে বংশগত ব্রাহ্মণ ছিল, তার আরেকটি প্রমাণ, একটি বাংলা প্রবচন ―

“বামুন নোম মুচি
একই দিনে শুচি”

বিদেশি তুর্কি শাসকরা, বঙ্গ দেশ দখল করে নিলে, এই অসহায় নমঃশূদ্রদের জনগোষ্ঠীর উপর জুলুম-নির্যাতন আরো বেড়ে যায়। সনাতন সমাজের সুবিধাভোগীরা ঐ অত‍্যাচারিত নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের নতুন নামকরন করে চাঁড়াল। কি নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণ !

বহুল আলোচিত ‘Bengal was divided’-গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বৃটিশদের চট-কলে পাটের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে, নমঃশূদ্র কৃষক সম্প্রদায় পাট-চাষে লাভবান হয়ে, অর্থের মুখ দেখে এবং বৃটিশ প্রবর্তিত শিক্ষার সংস্পর্শে এসে জানতে পারে যে,তারা অতীতে ব্রাহ্মণ ছিল। তখন তারা পৈতা ধারন করে ব্রাহ্মণ ঘোষণা করলে, উচ্চবর্ণ ও মধ‍্যবর্ণের হিন্দুরা একজোট হয়ে, নমঃশূদ্রদের ব্রাহ্মণ সমাজে পুনঃপ্রবেশ প্রতিহত করে। ব্রাহ্মণদের সংখ্যা বেড়ে গেলে, বংশগত ব্রাহ্মণদের যজমান কমে যাবে – এজন্য ঐ সময় ব্রাহ্মণরা বাধা দিয়েছিল ; কিন্তু মধ‍্যবর্ণের হিন্দুরা বাধা দিয়েছিল কেন ! নমঃশূদ্ররা ব্রাহ্মণ সমাজে ফিরে এলে, মধ্য বর্ণের আদৌ কি কোন ক্ষতি হতো ?

মহাত্মা গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রাণপণ প্রচেষ্টায়, ১৯১১ সালের সেন্সাস রিপোর্টে, চণ্ডাল শব্দটি আপসারন করা হয়।

বংশগত ব্রাহ্মণ বংশে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্ম প্রায়ই আমাকে বলে,”কাকু মশাই, আপনারা যে করেই হোক জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার একটা উপায় বের করুন। জাতিভেদ প্রথার জন্য সবাই ব্রাহ্মণদের দায়ী করে। পূর্ব পুরুষের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের জন্য আমরা লজ্জিত। জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে আমরা ব্রাহ্মণ পরিচয় ত‍্যাগ করতে প্রস্তুত আছি …”

ব্রাহ্মণ পরিচয় ত‍্যাগ করা যাবে না, বরং অন‍্যদের ব্রাহ্মণ সমাজে তুলে আনতে হবে। সর্বপ্রথম অধিকার-হারা দলিত ও নমঃশূদ্র সম্প্রদায়কে ব্রাহ্মণ সমাজে ফিরিয়ে এনে, উচ্চ স্থান তথা কুলীন ব্রাহ্মণের মর্যাদা দিয়ে-তাদের হারানো গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। এত অত‍্যাচার-অপমান এবং অন‍্যদের অর্থের প্রলোভন প্রত‍্যাখ‍্যান করে, নমঃশূদ্র ও দলিতরা সনাতন ধর্মের প্রতি সবার চেয়ে বেশি নিবেদিত।

মধ্যেবর্ণের হিন্দুদেরও উচিত ব্রাহ্মণ সমাজে উন্নীত হওয়া। সমস্ত সনাতন হিন্দুর জন্ম – কোন না কোন ব্রাহ্মণ ঋষির গোত্রে। সর্বোপরি আদিপিতা ব্রাহ্মণ মনুর বংশধর সমস্ত সনাতন হিন্দু জন্মগত ভাবে ব্রাহ্মণ। সনাতন ধর্মে জাতিভেদের কোন স্থান নেই।

ব্রাহ্মণ-বিদ্বেষী প্রচার হচ্ছে, হিন্দু জাতিকে জ্ঞান থেকে বিচ‍্যুত করার, এক গভীর ষড়যন্ত্র। ব্রাহ্মণ শব্দের অর্থ – যার ব্রহ্মজ্ঞান আছে। ব্রহ্মাজ্ঞান হচ্ছে – সৃষ্টি সম্পর্কিত জ্ঞান। যে জাতি যত উৎকৃষ্ট ব্রহ্মাজ্ঞানের অধিকারী, সেই জাতি তত উন্নত ও শক্তিশালী। সনাতন ধর্মের মূলতত্ত্ব ব্রহ্মজ্ঞান ; কারণ সনাতন ধর্মের একমাত্র ধর্মগ্রন্থ হচ্ছে ‘বেদ’। ‘বেদ’ – শব্দের অর্থ জ্ঞান – যা কিনা যাবতীয় বস্তুগত জ্ঞানের প্রতীক। ধর্মগ্রন্থের যিনি ব‍্যখ‍্যা করেন, তিনি হচ্ছেন ‘ঋষি’। ‘ঋষি’ – শব্দের অর্থ হচ্ছে, দ্রষ্টা বা দার্শনিক। সুতরাং সনাতন ধর্ম – সম্পূর্ণ জ্ঞান নির্ভর। সমস্ত অপাত্রে অন্ধভক্তি – অন্ধবিশ্বাস – কুসংস্কার – নারী বিদ্বেষ -বর্ণবাদ ইত্যাদি আবর্জনা – জ্ঞানের আগুনে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে হবে। পৃথিবীতে ইহুদিদের সংখ্যা সোয়া কোটির সামান্য বেশি। মাত্র ৫০ লাখ উৎকৃষ্ট ব্রহ্মাজ্ঞানী ইহুদি, সমস্ত পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করছে। পৃথিবীতে এখনো ১১৪ কোটি সনাতন হিন্দু অবশিষ্ট আছে।

Leave a Reply