শিব পুজো করার আগে জেনে নিন শিবলিঙ্গ কি?

লিঙ্গ কথার অর্থ হল প্রতীক চিহ্ন | আর শিবলিঙ্গ হলো, ভগবান শিবের নির্গুণ ব্রহ্মের প্রতীক চিহ্ন | ভগবান শিব কে বলা হয় পরমেশ্বর | শিবলিঙ্গ পরমেশ্বর ভগবান শিবের ধ্যান মগ্নতার প্রতীক, শান্ত হওয়ার প্রতীক | ভগবান শিব আত্মধ্যানে লীন থাকেন, আর এই সংসারের সমস্ত মানুষকে অন্তর্মুখী হয়ে ধান মগ্ন থাকার উপদেশ দেন |

“লয়ং যাতি ইতি লিঙ্গ” অর্থাৎ যার মধ্যে সবকিছু লয় হয়ে যায় তাই হল লিঙ্গ | 

অন্তর্মুখী ধ্যান অভ্যাসের মাধ্যমে, পঞ্চ ইন্দ্রিয়, ষড়ঋপু, (পঞ্চ ইন্দ্রিয় হলো ঘ্রাণ আস্বাদন শ্রবণ দর্শন স্পর্শ আর ষড়ঋপু হল কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মদ মাৎসর্য) এই সমস্ত কিছু লয় প্রাপ্ত করে, মানুষ দেবগুণ সম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে | পরমেশ্বর ভগবান-শিব হিন্দু ধর্মের দেবতা হলেও যে কোন ধর্মের মানুষ ভগবান শিবের এই উপদেশ পালন করে, আত্মার উন্নতির সাথে সাথে নিজের ও সংসারের উন্নতি করতে পারে |

শিবলিঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞতাবশত কিছু ভুল তথ্য প্রচার হয়েছে, যেমন লিঙ্গ শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত লিঙ্গম শব্দ থেকে, যার অর্থ প্রতীক চিহ্ন। যেমন অর্থের অর্থ হলো টাকা । কিন্তু বাংলা ব্যাকরণ এ লিঙ্গ শব্দ ব্যবহার করা হয় নারী-পুরুষ বিভাজন বা চিহ্নিতকরণের জন্য, যেমন পু লিঙ্গ, স্ত্রী লিঙ্গ, ক্লিবলিঙ্গ। তাই লিঙ্গ শব্দ নারী- পুরুষের চিহ্নিতকরণ ছাড়াও নারী পুরুষের জননেন্দ্রিয় অর্থ লাভ করেছে, যা কিনা একদম বিকৃত ও অশালীন | যেমন লিঙ্গ পুরাণ একটি গ্রন্থ, এই গ্রন্থ সম্বন্ধে যারা কিছুই না জানে, তাদের মনে ধারণা আসতে পারে যে, এই গ্রন্থে জননেন্দ্রিয় সম্বন্ধে কিছু বিস্তারিত লেখা আছে |

এই ধরনের ধারণা যা কিনা সম্পূর্ণ ভুল, কারণ লিঙ্গ পুরাণ গ্রন্থে ভগবান শিবের ও মহাজাগতিক বিষয়াবলী, পৌরাণিক কাহিনী, জ্যোতিষের কিছু তথ্য, যেমন ঋতু সম্বন্ধে, উৎসব, ভূগোল, তীর্থযাত্রা, ইত্যাদি বিষয়বস্তু সম্বন্ধে লেখা আছে, জননেন্দ্রিয় সম্বন্ধে নয় | (যেমন এখানে নয় অর্থ না বলা হয়েছে) ভারতবর্ষের বীর সন্ন্যাসী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ ১৯০০ সালে প্যারিসে ধর্মীয় আলোচনায় বলেছিলেন, শিবলিঙ্গ ধারণাটি এসেছে অথর্ববেদ সংহিতা গ্রন্থের যূপ-স্তম্ভ বা স্কম্ভ নামক একপ্রকার বলিদান স্তম্ভের স্তোত্র থেকে | (এখানে যূপ-স্তম্ভ মানে এক ধরনের খুটি বা খাম্বা বোঝায়, স্তোত্র মানে জপকরা বা শ্লোক বা মন্ত্র বোঝায়) সেখান থেকেই প্রথম শিবলিঙ্গ পুজোর কথা জানা যায় | এই স্তোত্র বা মন্ত্র বা শ্লোকে, আদি ও অন্তহীন এক স্তম্ভের বর্ণনা পাওয়া যায়, যা চিরন্তন ব্রহ্মের স্থলে স্থাপিত |

এবং যজ্ঞের আগুন, ধোঁয়া, সোমলতা, ও যজ্ঞ কাষ্ঠ বাহী বৃষ, এর ধারণাটি থেকে এবং শিবের উজ্জ্বল দেহ, তার জটাজাল, নীলকন্ঠ ও বাহন বৃষ, এর একটি ধারণা পাওয়া যায় | (এখানে সোমলতা অর্থ আখ, কাষ্ঠ অর্থ কাঠ, এবং বৃষ অর্থ ষাঁড়, বোঝানো হয়েছে) তাই মনে করা হয় ওই যূপস্তম্ভ বা খাম্বা, কালক্রমে শিবলিঙ্গে পরিণত হয়েছে | লিঙ্গ পুরাণ গ্রন্থে এই মন্ত্র বা শ্লোক বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে | এছাড়া স্বামী শিবানন্দও শিবলিঙ্গকে যৌনাঙ্গের প্রতীক বলে স্বীকার করেননি, তিনি বলেন,”এটি শুধু ভূল ই নয় বরং অন্ধ অভিযোগ ও বটে যে শিবলিঙ্গ পুরুষ যৌনাঙ্গের প্রতিনিধিত্বকারী।”তিনি লিঙ্গপুরানের একটি শ্লোকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন-
“প্রধানাম প্রকৃতির যদাধুর লিঙ্গমুত্তমম গান্ধবর্নরসাহৃনম শব্দ স্পর্শাদি বর্জিতম”
অর্থাত্‍ লিঙ্গ হল প্রকৃতির সর্বোচ্চ প্রকাশক যা স্পর্শ, বর্ন,গন্ধহীন |
হিন্দু ধর্মে বহু ধরনের শিবলিঙ্গ পূজার প্রচলন আছে, যেমন নর্মদেশ্বর বা বানেশ্বর লিঙ্গ, স্ফটিক লিঙ্গ, পারদ লিঙ্গ, রত্ন লিঙ্গ, ধাতু লিঙ্গ, ইত্যাদি বানেশ্বর লিঙ্গ যা নর্মদা নদীর গর্ভে এক ধরনের শিলা পাওয়া যায়, এই শিলা নর্মদা নদীর গর্ভে সৃষ্টি বলে একে নর্মদেশ্বর ও বলা হয় |

এই শিলার অভিষেক করা গঙ্গাজল, দুধ, দই, ইত্যাদি চারিদিকে না ছড়িয়ে, একদিক থেকে নির্দিষ্ট স্থানে চলে যায় তেমন স্থানে রেখে পুজো দেওয়ার প্রচলন আছে, হতে পারে এই নিয়ম কালক্রমে বর্তমান শিবলিঙ্গ তে রূপান্তরিত হয়েছে |

Tags: শিবলিঙ্গ কি? , মহাদেব

Leave a Reply